যাকাত ও ছাদাক্বা

প্রবন্ধটি পড়া হলে শেয়ার করতে ভুলবেন না।

শুরু করছি মহান আল্লাহর নামে যানি পরম করুনাময়, অসীম দয়ালু।

যাকাত ও ছাদাক্বা

1404446973

যাকাত ও ছাদাক্বা

‘যাকাত’ অর্থ বৃদ্ধি পাওয়া, পবিত্রতা ইত্যাদি। পারিভাষিকঅর্থে ঐ দান, যা আল্লাহরনিকটে ক্রমশঃ বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয় এবং যাকাত দাতারমালকে পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করে।‘ছাদাক্বা’ অর্থ ঐ দান যার দ্বারা আল্লাহরনৈকট্য লাভ হয়। পারিভাষিক অর্থে যাকাতও ছাদাক্বা মূলতঃ একই মর্মার্থেব্যবহৃত হয়।

যাকাত ওছাদাক্বার উদ্দেশ্য :

যাকাত ওছাদাক্বার মূল উদ্দেশ্য হ’ল দারিদ্র্য বিমোচন ও ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ। রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেন,

إِنَّ اللهَ قّدْ فَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَاءِهِمْ فَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَاءِهِمْ– ‘

আল্লাহ তাদেরউপরে ছাদাক্বা ফরয করেছেন। যা তাদের ধনীদের নিকট থেকে নেওয়া হবে ও তাদের গরীবদেরমধ্যে ফিরিয়ে দেওয়া হবে’[1]

যাকাতেরপ্রকারভেদ :

যাকাত চার প্রকারমালে ফরয হয়ে থাকে। ১. স্বর্ণ-রৌপ্য বাসঞ্চিত টাকা-পয়সা ২. ব্যবসায়রত সম্পদ ৩.উৎপন্ন ফসল ৪. গবাদি পশু।টাকা-পয়সা একবছর সঞ্চিত থাকলে শতকরা আড়াই টাকা বা ৪০ভাগের ১ ভাগ হারেযাকাত বের  করতে  হয়।  ব্যবসায়রত  সম্পদ  ও  গবাদি  পশুর মূলধনের এক বছরহিসাবকরে যাকাত দিতে হয়। উৎপন্ন ফসল যেদিন হস্তগত হবে, সেদিনই যাকাত (ওশর) ফরয হয়। এরজন্য বছরপূর্তি শর্ত নয়।

যাকাতের নিছাব :

১. স্বর্ণ-রৌপ্যে পাঁচ উক্বিয়া বা ২০০ দিরহাম।

২. ব্যবসায়রতসম্পদ-এর নিছাবস্বর্ণ-রৌপ্যের ন্যায়।

৩. খাদ্য শস্যের নিছাব পাঁচঅসাক্ব, যা হিজাযী ছা‘ অনুযায়ী১৯ মণ ১২ সেরের কাছাকাছি বা ৭১৭ কেজির মতহয়। এতে ওশর বা এক দশমাংশ নির্ধারিত।সেচা পানিতে হ’লে নিছফে ওশর বা ১/২০অংশ নির্ধারিত।

৪.গবাদি পশু : (ক) উট ৫টিতে একটি ছাগল (খ) গরু-মহিষ৩০টিতে ১টি দ্বিতীয় বছরেপদার্পণকারী বাছুর (গ) ছাগল-ভেড়া-দুম্বা ৪০টিতেএকটি ছাগল।[2]

যাকাতুল ফিৎর :

এটিও ফরয যাকাত, যা ঈদুল ফিৎরের ছালাতে বের হওয়ার আগেই মাথাপ্রতি এক ছা‘ বা মধ্যম হাতের চার অঞ্জলী (আড়াই কেজি) হিসাবে দেশের প্রধানখাদ্যশস্য হ’তে প্রদানকরতে হয়। আব্দুল্লাহ ইবনু ওমর (রাঃ) বলেন, ‘রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) স্বীয় উম্মতেরস্বাধীন ও ক্রীতদাস, পুরুষ ও নারী, ছোট ওবড় সকলের উপর মাথা পিছু এক ছা‘ খেজুর, যবইত্যাদি (অন্য বর্ণনায়)খাদ্যবস্ত্ত ফিৎরার যাকাত হিসাবে ফরয করেছেন এবং তাঈদগাহের উদ্দেশ্যে বেরহওয়ার পূর্বেই আমাদেরকে জমা দেয়ার নির্দেশ দান করেছেন’।[3]ছোট-বড়, ধনী-গরীব সকল মুসলিম নর-নারীর উপরে যাকাতুল ফিৎর ফরয। এর জন্য ‘ছাহেবে নিছাব’ অর্থাৎ সাংসারিক প্রয়োজনীয় বস্ত্তসমূহ বাদে ২০০ দিরহাম বাসাড়ে ৫২তোলা রূপা কিংবা সাড়ে ৭ তোলা স্বর্ণের মালিক হওয়া শর্ত নয়।

ছাদাক্বা ব্যয়েরখাত সমূহ :

পবিত্র কুরআনেসূরায়ে তওবা ৬০নং আয়াতে ফরয ছাদাক্বা সমূহ ব্যয়ের আটটি খাত বর্ণিত হয়েছে। যথা-

১.ফক্বীর :নিঃসম্বল ভিক্ষাপ্রার্থী, ২.মিসকীন :যে ব্যক্তি নিজের প্রয়োজন মিটাতেও পারে না, মুখ ফুটে চাইতেও পারেনা। বাহ্যিকভাবে তাকে সচ্ছল বলেই মনে হয়, ৩.আমেলীন :যাকাত আদায়ের জন্যনিয়োজিত কর্মকর্তা ও কর্মচারীগণ, ৪.ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট ব্যক্তিগণ।অমুসলিমদেরকে ইসলামে দাখিল করাবার জন্য এই খাতটি নির্দিষ্ট, ৫. দাসমুক্তির জন্য।এই খাত বর্তমানে শূন্য। তবে অনেকে অসহায় কয়েদী মুক্তিকে এই খাতের অন্তর্ভুক্ত গণ্যকরেছেন(কুরতুবী), ৬.ঋণগ্রস্তব্যক্তি :যার সম্পদের তুলনায় ঋণের অংক বেশী। কিন্তু যদি তার ঋণ থাকে ও সম্পদনাথাকে, এমতাবস্থায় সে ফক্বীর ও ঋণগ্রস্ত দু’টি খাতের হকদার হবে, ৭. ফীসাবীলিল­াহ বা আল্লাহর রাস্তায় ব্যয় করা ৮.দুস্থমুসাফির :পথিমধ্যে কোন কারণবশতঃ পাথেয় শূন্য হয়ে পড়লে পথিকগণ এই খাত হ’তেসাহায্যপাবেন। যদিও তিনি নিজ দেশে বা বাড়ীতে সম্পদশালী হন। ফিৎরা অন্যতম ফরযযাকাত হিসাবে তা উপরোক্ত খাত সমূহে বা ঐগুলির একাধিক খাতে ব্যয় করতে হবে।খাতবহির্ভূতভাবে কোন অমুসলিমকে ফিৎরা দেওয়া জায়েয নয়।[4]

বায়তুল মাল জমা করা :

ফিৎরা ঈদের এক বাদু’দিন পূর্বে বায়তুল মালে জমা করাসুন্নাত। ইবনু ওমর (রাঃ) অনুরূপভাবে জমা করতেন।ঈদুল ফিৎরের দু’তিন দিনপূর্বে খলীফার পক্ষ হ’তে ফিৎরা জমাকারীগণ ফিৎরা সংগ্রহেরজন্য বসতেন ওলোকেরা তাঁর কাছে গিয়ে ফিৎরা জমা করত। ঈদের পরে হকদারগণের মধ্যেবণ্টন করাহ’ত।[5]

যাকাত-ওশর-ফিৎরা-কুরবানী ইত্যাদি ফরয ও নফলছাদাক্বা  রাষ্ট্র  কিংবা  কোন বিশ্বস্ত ইসলামী সংস্থা-র নিকটে জমা করা, অতঃপর সেইসংস্থা-র মাধ্যমেবণ্টন করাই হ’ল বায়তুল মাল বণ্টনের সুন্নাতী তরীকা।ছাহাবায়ে কেরামের যুগে এব্যবস্থাই চালু ছিল। তাঁরা কখনোই নিজেদের যাকাতনিজেরা হাতে করে বণ্টন করতেন না।বরং যাকাত সংগ্রহকারীর নিকটে গিয়ে জমাদিয়ে আসতেন। এখনও সঊদী আরব, কুয়েত প্রভৃতিদেশে এ রেওয়াজ চালু আছে।

 

[1]. মুত্তাফাক্বআলাইহ, মিশকাত হা/১৭৭২ যাকাতঅধ্যায়।

[2]. বিস্তারিত নিছাবদ্রঃ বঙ্গানুবাদ খুৎবা’ ‘যাকাতঅধ্যায়।

[3]. বুখারী, মুসলিম; মিশকাত হা/১৮১৫-১৬।

[4]. ফিক্বহুস সুন্নাহ ১/৩৮৬; মিরআৎ হা/১৮৩৩-এর ব্যাখ্যা, ১/২০৫-৬।

[5]. দ্রঃ বুখারী, ফাৎহুল বারীহা/১৫১১-এর আলোচনা, মিরআৎ ১/২০৭ পৃঃ।

মন্তব্য করুন

Loading Facebook Comments ...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *